sandhi

sandhi

(শুনতে থাকার সময় স্ক্রিন অন রাখুন। স্ক্রিন অটো-অফ হবে না।)

সন্ধি: প্রাথমিক ধারণা ও সংজ্ঞা

সন্ধি শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘মিলন’ বা ‘যুক্ত হওয়া’। ব্যাকরণের ভাষায়— পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনির মিলনে যদি এক নতুন ধ্বনির সৃষ্টি হয় বা ধ্বনির রূপান্তর ঘটে, তবে তাকে সন্ধি বলে।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “পাশাপাশি অবস্থিত দুই ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে।” পাণিনির মতে, “পরঃ সন্নিকর্ষঃ সংহিতা” অর্থাৎ দুটি বর্ণের অত্যন্ত নৈকট্যকেই সন্ধি বা সংহিতা বলে।

সন্ধির উদ্দেশ্য

১. উচ্চারণের সাবলীলতা: কথা বলার সময় দ্রুততার কারণে শব্দগুলিকে আমরা জুড়ে দিই, এতে উচ্চারণ সহজ হয় (যেমন: ‘বিদ্যা’ ও ‘আলয়’ আলাদা না বলে ‘বিদ্যালয়’ বলা সহজ)। ২. শ্রুতিমাধুর্য: সন্ধিবদ্ধ শব্দ শুনতে অনেক বেশি শ্রুতিমধুর ও সুসংহত লাগে। ৩. নতুন শব্দ গঠন: সন্ধি বাংলা ভাষায় শব্দ গঠনের অন্যতম প্রধান উপায়।

সন্ধি ও সমাসের মধ্যে পার্থক্য (পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)

অনেক সময় পরীক্ষার্থীরা সন্ধি ও সমাস গুলিয়ে ফেলেন।

  • সন্ধি হলো ধ্বনির সাথে ধ্বনির মিলন। (বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়; এখানে ‘আ’ ধ্বনির সাথে ‘আ’ ধ্বনির মিলন হয়েছে)।

  • সমাস হলো পদের সাথে পদের বা শব্দের সাথে শব্দের মিলন। (বিদ্যার নিমিত্ত আলয় = বিদ্যালয়; এখানে কয়েকটি পদের মিলন হয়েছে)।

  • সন্ধিতে উচ্চারণের ওপর জোর দেওয়া হয়, সমাসে অর্থের ওপর জোর দেওয়া হয়।


সন্ধির প্রকারভেদ

উৎস ও প্রকৃতি অনুযায়ী বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সন্ধিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: ১. খাঁটি বাংলা সন্ধি ২. তৎসম বা সংস্কৃত সন্ধি


১. খাঁটি বাংলা সন্ধি

খাঁটি বাংলা বা তদ্ভব শব্দের মধ্যে যে সন্ধি হয়, তাকে খাঁটি বাংলা সন্ধি বলে। এই সন্ধিতে সংস্কৃত ব্যাকরণের কঠোর নিয়ম সবসময় খাটে না; বরং বাংলা ভাষার নিজস্ব উচ্চারণ রীতি ও ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়ম (যেমন- স্বরসঙ্গতি, সমীভবন) বেশি প্রভাব ফেলে। খাঁটি বাংলা সন্ধি দুই প্রকার:

ক) খাঁটি বাংলা স্বরসন্ধি

স্বরধ্বনির সাথে স্বরধ্বনির মিলনে এই সন্ধি হয়।

  • নিয়ম ১ (স্বরলোপ): পাশাপাশি দুটি স্বরধ্বনি থাকলে দ্রুত উচ্চারণের ফলে একটি স্বরধ্বনি লোপ পায়।

    • অ + এ = এ (অ লোপ): শত + এক = শতেক, কত + এক = কতেক।

    • আ + আ = আ (একটি আ লোপ): শাঁখা + আরি = শাঁখারি, রূপা + আলি = রূপালি।

    • আ + উ = উ (আ লোপ): মিথ্যা + উক = মিথ্যুক, নিন্দা + উক = নিন্দুক।

    • ই + এ = ই (এ লোপ): কুড়ি + এক = কুড়িক।

খ) খাঁটি বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি

স্বরধ্বনির সাথে ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে স্বরধ্বনি অথবা ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে ব্যঞ্জনধ্বনির মিলনে এই সন্ধি হয়। এর প্রধান নিয়ম হলো সমীভবন (Assimilation)।

  • নিয়ম ১ (অঘোষ ধ্বনির ঘোষীভবন): বর্গের প্রথম অঘোষ ধ্বনির (ক, চ, ট, ত, প) পর স্বরধ্বনি থাকলে তা ঘোষ ধ্বনিতে (গ, জ, ড, দ, ব) পরিণত হয়।

    • ছোট + দা = ছোডদা (ট > ড)

    • বড় + দাদা = বডদাদা > বর্দা

  • নিয়ম ২ (ত/দ-এর পর চ/ছ থাকলে): ত বা দ-এর পর চ বা ছ থাকলে, ত/দ স্থানে ‘চ’ হয়।

    • কাঁচ + কলা = কাঁচকলা (উচ্চারণে পরিবর্তন)

    • নাত + জামাই = নাজ্জামাই (ত > জ)

  • নিয়ম ৩ (স্বরলোপ ও ব্যঞ্জনলোপ): * পাঁচ + শ = পাঁশশো (চ লোপ এবং শ-এর দ্বিত্ব)

    • আর + না = আন্না (র > ন)


২. তৎসম বা সংস্কৃত সন্ধি (পরীক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ)

বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারের একটি বিশাল অংশ তৎসম শব্দ। এই শব্দগুলি সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম মেনেই সন্ধিবদ্ধ হয়। সংস্কৃত সন্ধি প্রধানত তিন প্রকার: ১. স্বরসন্ধি ২. ব্যঞ্জনসন্ধি ৩. বিসর্গ সন্ধি


২.১ সংস্কৃত স্বরসন্ধি (Vowel Sandhi)

স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনকে স্বরসন্ধি বলে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের একটি বড় অংশ এখান থেকে আসে। এর নির্দিষ্ট কিছু সূত্র রয়েছে:

সূত্র ১: অ-কার বা আ-কারের পর অ-কার বা আ-কার থাকলে উভয়ে মিলে আ-কার (া) হয়। আ-কার পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনে যুক্ত হয়।

  • অ + অ = আ: নব + অন্ন = নবান্ন, হিম + অদ্রি = হিমাদ্রি, সূর্য + অস্ত = সূর্যাস্ত।

  • অ + আ = আ: দেব + আলয় = দেবালয়, হিম + আলয় = হিমালয়, রত্ন + আকর = রত্নাকর।

  • আ + অ = আ: যথা + অর্থ = যথার্থ, বিদ্যা + অর্থী = বিদ্যার্থী, মহা + অর্ঘ = মহার্ঘ।

  • আ + আ = আ: বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়, মহা + আশয় = মহাশয়, কারা + আগার = কারাগার।

সূত্র ২: ই-কার বা ঈ-কারের পর ই-কার বা ঈ-কার থাকলে উভয়ে মিলে দীর্ঘ ঈ-কার (ী) হয়।

  • ই + ই = ঈ: অতি + ইব = অতীব, রবি + ইন্দ্র = রবীন্দ্র, মুনি + ইন্দ্র = মুনীন্দ্র।

  • ই + ঈ = ঈ: পরি + ঈক্ষা = পরীক্ষা, গিরি + ঈশ = গিরীশ।

  • ঈ + ই = ঈ: শচী + ইন্দ্র = শচীন্দ্র, সতী + ইন্দ্র = সতীন্দ্র।

  • ঈ + ঈ = ঈ: পৃথ্বী + ঈশ্বর = পৃথ্বীশ্বর, সতী + ঈশ = সতীশ।

সূত্র ৩: উ-কার বা ঊ-কারের পর উ-কার বা ঊ-কার থাকলে উভয়ে মিলে দীর্ঘ ঊ-কার (ূ) হয়।

  • উ + উ = ঊ: সু + উক্ত = সূক্ত, মরু + উদ্যান = মরূদ্যান, বহু + ঊর্ধ্ব = বহূর্ধ্ব।

  • উ + ঊ = ঊ: লঘু + ঊর্মি = লঘূর্মি, সিন্ধু + ঊর্মি = সিন্ধূর্মি।

  • ঊ + উ = ঊ: বধূ + উৎসব = বধূৎসব।

  • ঊ + ঊ = ঊ: ভূ + ঊর্ধ্ব = ভূর্ধ্ব।

সূত্র ৪ (গুণ সন্ধি – একার): অ-কার বা আ-কারের পর ই-কার বা ঈ-কার থাকলে উভয়ে মিলে এ-কার (ে) হয়।

  • অ + ই = এ: দেব + ইন্দ্র = দেবেন্দ্র, স্ব + ইচ্ছা = স্বেচ্ছা।

  • অ + ঈ = এ: অপ + ঈক্ষা = অপেক্ষা, পরম + ঈশ্বর = পরমেশ্বর।

  • আ + ই = এ: যথা + ইষ্ট = যথেষ্ট, মহা + ইন্দ্র = মহেন্দ্র।

  • আ + ঈ = এ: রমা + ঈশ = রমেশ, মহা + ঈশ্বর = মহেশ্বর।

সূত্র ৫ (গুণ সন্ধি – ওকার): অ-কার বা আ-কারের পর উ-কার বা ঊ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ও-কার (ো) হয়।

  • অ + উ = ও: সূর্য + উদয় = সূর্যোদয়, পর + উপকার = পরোপকার।

  • অ + ঊ = ও: চল + ঊর্মি = চলোর্মি, নব + ঊঢ়া = নবোঢ়া।

  • আ + উ = ও: যথা + উচিত = যথোচিত, মহা + উৎসব = মহোৎসব।

  • আ + ঊ = ও: গঙ্গা + ঊর্মি = গঙ্গোর্মি।

সূত্র ৬ (অর/আর সন্ধি): অ-কার বা আ-কারের পর ঋ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ‘অর’ হয় (যা রেফ ‘র্’ হয়ে পরের বর্ণে বসে)।

  • অ + ঋ = অর: দেব + ঋষি = দেবর্ষি, সপ্ত + ঋষি = সপ্তর্ষি।

  • আ + ঋ = অর: মহা + ঋষি = মহর্ষি, রাজা + ঋষি = রাজর্ষি।

  • বিশেষ নিয়ম: ঋত শব্দ পরে থাকলে অ/আ + ঋ মিলে ‘আর’ হয়। যেমন: শীত + ঋত = শীতার্ত, ক্ষুধা + ঋত = ক্ষুধার্ত।

সূত্র ৭ (বৃদ্ধি সন্ধি – ঐকার): অ-কার বা আ-কারের পর এ-কার বা ঐ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ঐ-কার (ৈ) হয়।

  • অ + এ = ঐ: জন + এক = জনৈক, হিত + এষী = হিতৈষী।

  • অ + ঐ = ঐ: মত + ঐক্য = মতৈক্য, পরম + ঐশ্বর্য = পরমৈশ্বর্য।

  • আ + এ = ঐ: সদা + এব = সদৈব, তথা + এব = তথৈব।

  • আ + ঐ = ঐ: মহা + ঐশ্বর্য = মহৈশ্বর্য।

সূত্র ৮ (বৃদ্ধি সন্ধি – ঔকার): অ-কার বা আ-কারের পর ও-কার বা ঔ-কার থাকলে উভয়ে মিলে ঔ-কার (ৌ) হয়।

  • অ + ও = ঔ: জল + ওকা = জলৌকা, দন্ত + ওষ্ঠ = দন্তৌষ্ঠ (বা দন্তোষ্ঠ)।

  • অ + ঔ = ঔ: পরম + ঔষধ = পরমৌষধ।

  • আ + ও = ঔ: মহা + ওষধি = মহৌষধি।

  • আ + ঔ = ঔ: মহা + ঔষধ = মহৌষধ।

সূত্র ৯ (য-ফলা সন্ধি): ই-কার বা ঈ-কারের পর ই/ঈ ভিন্ন অন্য স্বরধ্বনি থাকলে ই/ঈ স্থানে ‘য’ (য-ফলা) হয়।

  • ই + অ = য + অ: অতি + অন্ত = অত্যন্ত, যদি + অপি = যদ্যপি।

  • ই + আ = য + আ: ইতি + আদি = ইত্যাদি, পরি + আলোচনা = পর্যালোচনা।

  • ই + উ = য + উ: অতি + উক্তি = অত্যুক্তি, প্রতি + উত্তর = প্রত্যুত্তর।

  • ই + এ = য + এ: প্রতি + এক = প্রত্যেক।

  • ঈ + আ = য + আ: মসী + আধার = মস্যান্ধার, নদী + অম্বু = নদ্যম্বু।

সূত্র ১০ (ব-ফলা সন্ধি): উ-কার বা ঊ-কারের পর উ/ঊ ভিন্ন অন্য স্বরধ্বনি থাকলে উ/ঊ স্থানে ‘ব’ (ব-ফলা) হয়।

  • উ + অ = ব + অ: সু + অল্প = স্বল্প, অনু + অয় = অন্বয়।

  • উ + আ = ব + আ: সু + আগত = স্বাগত, পশু + আচার = পশ্বাচার।

  • উ + ই = ব + ই: অনু + ইত = অন্বিত।

  • উ + এ = ব + এ: অনু + এষণ = অন্বেষণ।

সূত্র ১১ (অয়, আয়, অব, আব সন্ধি): এ, ঐ, ও, ঔ-কারের পর স্বরধ্বনি থাকলে এ স্থানে ‘অয়’, ঐ স্থানে ‘আয়’, ও স্থানে ‘অব’ এবং ঔ স্থানে ‘আব’ হয়।

  • এ + অ = অয়: নে + অন = নয়ন, শে + অন = শয়ন।

  • ঐ + অ = আয়: গৈ + অক = গায়ক, নৈ + অক = নায়ক।

  • ও + অ = অব: পো + অন = পবন, ভো + অন = ভবন।

  • ও + ই = অবি: পো + ইত্র = পবিত্র।

  • ঔ + অ = আব: পৌ + অক = পাবক।

  • ঔ + উ = আবু: ভৌ + উক = ভাবুক।

  • ঔ + ই = আবি: নৌ + ইক = নাবিক।


২.২ সংস্কৃত ব্যঞ্জনসন্ধি (Consonant Sandhi)

স্বরধ্বনির সঙ্গে ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে ব্যঞ্জনধ্বনির মিলনকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। এটি আয়ত্ত করার জন্য বর্গের (ক-বর্গ, চ-বর্গ, ট-বর্গ, ত-বর্গ, প-বর্গ) ধারণা থাকা জরুরি।

সূত্র ১ (অঘোষ ধ্বনির স্থানে ঘোষ ধ্বনি): বর্গের প্রথম বর্ণ (ক, চ, ট, ত, প) -এর পর স্বরধ্বনি, বর্গের তৃতীয়/চতুর্থ বর্ণ অথবা য, র, ল, ব, হ থাকলে বর্গের প্রথম বর্ণটি সেই বর্গের তৃতীয় বর্ণে (গ, জ, ড, দ, ব) পরিণত হয়।

  • ক > গ: দিক + অন্ত = দিগন্ত, বাক + দেবী = বাগদেবী, ঋক + বেদ = ঋগ্বেদ।

  • চ > জ: ণিজ + অন্ত = নিজন্ত।

  • ট > ড (ড়): ষট + আনন = ষড়ানন, ষট + যন্ত্র = ষড়যন্ত্র।

  • ত > দ: জগৎ + নাথ = জগন্নাথ (ব্যতিক্রম, সূত্র ২ দেখুন), উৎ + ঘাটন = উদ্ঘাটন, সৎ + উপায় = সদুপায়, জগৎ + ঈশ্বর = জগদীশ্বর।

  • প > ব: সুপ + অন্ত = সুবন্ত।

সূত্র ২ (ত/দ এর বিশেষ নিয়ম – চ/ছ): ত বা দ-এর পর চ বা ছ থাকলে, ত/দ স্থানে ‘চ’ হয়।

  • উৎ + চারণ = উচ্চারণ।

  • বিপদ্ + চয় = বিপচ্চয়।

  • সৎ + চরিত্র = সচ্চরিত্র।

সূত্র ৩ (ত/দ এর বিশেষ নিয়ম – জ/ঝ): ত বা দ-এর পর জ বা ঝ থাকলে, ত/দ স্থানে ‘জ’ হয়।

  • সৎ + জন = সজ্জন।

  • বিপদ্ + জাল = বিপজ্জাল।

  • যাবৎ + জীবন = যাবজ্জীবন।

সূত্র ৪ (ত/দ এর বিশেষ নিয়ম – শ): ত বা দ-এর পর ‘শ’ থাকলে, ত/দ স্থানে ‘চ’ এবং শ স্থানে ‘ছ’ হয়। (ত্ + শ = চ্ছ)।

  • উৎ + শ্বাস = উচ্ছ্বাস।

  • চলৎ + শক্তি = চলচ্ছক্তি।

  • উৎ + শৃঙ্খল = উচ্ছৃঙ্খল।

সূত্র ৫ (ত/দ এর বিশেষ নিয়ম – হ): ত বা দ-এর পর ‘হ’ থাকলে, ত/দ স্থানে ‘দ’ এবং হ স্থানে ‘ধ’ হয়। (ত্ + হ = দ্ধ)।

  • উৎ + হার = উদ্ধার।

  • পদ্ + হতি = পদ্ধতি।

  • তৎ + হিত = তদ্ধিত।

সূত্র ৬ (ত/দ এর বিশেষ নিয়ম – ড/ঢ এবং ল): * ত/দ + ড/ঢ = ড্ড: উৎ + ডীন = উড্ডীন।

  • ত/দ + ল = ল্ল: উৎ + লেখ = উল্লেখ, তদ্ + লিখিত = তল্লিখিত।

সূত্র ৭ (নাসিক্যীভবন): বর্গের প্রথম বর্ণের (ক, চ, ট, ত, প) পর নাসিক্য ধ্বনি (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম) থাকলে, প্রথম বর্ণটি সেই বর্গের পঞ্চম বা নাসিক্য বর্ণে পরিণত হয়।

  • বাক + ময় = বাঙ্ময়।

  • তৎ + ময় = তন্ময়।

  • জগৎ + নাথ = জগন্নাথ।

  • মৃৎ + ময় = মৃন্ময়।

সূত্র ৮ (ম-এর পর স্পর্শ বর্ণ): ‘ম’-এর পর ক থেকে ম পর্যন্ত যেকোনো স্পর্শ বর্ণ থাকলে, ‘ম’ স্থানে সেই বর্গের নাসিক্য বর্ণ (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম) বা অনুস্বার (ং) হয়। (বর্তমানে বাংলায় অনুস্বার লেখাই বেশি প্রচলিত)।

  • সম + কল্প = সংকল্প (বা সঙ্কল্প)।

  • সম + খ্যা = সংখ্যা।

  • সম + গীত = সঙ্গীত (বা সংগীত)।

  • সম + চয় = সঞ্চয়।

  • সম + তাপ = সন্তাপ।

সূত্র ৯ (ম-এর পর অন্তঃস্থ বা উষ্ম বর্ণ): ‘ম’-এর পর য, র, ল, ব, শ, ষ, স, হ থাকলে ‘ম’ স্থানে সর্বদা অনুস্বার (ং) হয়।

  • সম + বাদ = সংবাদ।

  • সম + যম = সংযম।

  • সম + রক্ষণ = সংরক্ষণ।

  • সম + শয় = সংশয়।

  • সম + সার = সংসার।

সূত্র ১০ (ষ-এর নিয়ম): ‘ষ’-এর পর ত বা থ থাকলে, ত স্থানে ‘ট’ এবং থ স্থানে ‘ঠ’ হয়।

  • কৃষ্ + তি = কৃষ্টি।

  • বৃষ্ + তি = বৃষ্টি।

  • ষষ্ + থ = ষষ্ঠ।


২.৩ বিসর্গ সন্ধি (Visarga Sandhi)

বিসর্গ (ঃ) আসলে ‘র্’ এবং ‘স্’-এর সংক্ষিপ্ত বা রূূপান্তরিত রূপ। তাই বিসর্গকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়: র-জাত বিসর্গ এবং স-জাত বিসর্গ। স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে বিসর্গের মিলনকে বিসর্গ সন্ধি বলে।

সূত্র ১ (বিসর্গ + চ/ছ): বিসর্গের পর চ বা ছ থাকলে বিসর্গ স্থানে ‘শ’ (শ্চ/শ্ছ) হয়।

  • নিঃ + চয় = নিশ্চয়।

  • শিরঃ + ছেদ = শিরশ্ছেদ।

সূত্র ২ (বিসর্গ + ট/ঠ): বিসর্গের পর ট বা ঠ থাকলে বিসর্গ স্থানে ‘ষ’ (ষ্ট/ষ্ঠ) হয়।

  • ধনুঃ + টঙ্কার = ধনুষ্টঙ্কার।

  • নিঃ + ঠুর = নিষ্ঠুর।

সূত্র ৩ (বিসর্গ + ত/থ): বিসর্গের পর ত বা থ থাকলে বিসর্গ স্থানে ‘স’ (স্ত/স্থ) হয়।

  • মনঃ + তাপ = মনস্তাপ।

  • নিঃ + তার = নিস্তার।

  • দুঃ + থ = দুস্থ।

সূত্র ৪ (অ-কারান্ত বিসর্গ + ঘোষ ধ্বনি): ‘অ’-কারের পর অবস্থিত বিসর্গের পর যদি ‘অ’-কার, বর্গের ৩য়, ৪র্থ, ৫ম বর্ণ (গ, ঘ, ঙ, জ, ঝ, ঞ ইত্যাদি) অথবা য, র, ল, ব, হ থাকে, তবে পূর্ববর্তী ‘অ’ এবং বিসর্গ মিলে ও-কার (ো) হয়ে যায়।

  • ততঃ + অধিক = ততোধিক।

  • মনঃ + রথ = মনোরথ।

  • তিরঃ + ধান = তিরোধান।

  • সদঃ + জাত = সদ্যোজাত (সদঃ > সদ্যঃ)।

  • মনঃ + যোগ = মনোযোগ।

  • যশঃ + অভিলাষ = যশোভিলাষ।

সূত্র ৫ (অ/আ ভিন্ন অন্য স্বরের পর বিসর্গ): অ বা আ ছাড়া অন্য কোনো স্বরধ্বনির (ই, উ ইত্যাদি) পর বিসর্গ থাকলে এবং তার পরে স্বরধ্বনি, বর্গের ৩য়/৪র্থ/৫ম বর্ণ অথবা য, র, ল, ব, হ থাকলে বিসর্গ স্থানে ‘র’ বা রেফ (র্) হয়।

  • নিঃ + আকার = নিরাকার (র্ + আ = রা)।

  • দুঃ + অবস্থা = দুরবস্থা (র্ + অ = র)।

  • আশীঃ + বাদ = আশীর্বাদ (রেফ হয়ে পরবর্তী বর্ণে বসেছে)।

  • নিঃ + জন = নির্জন।

  • প্রাতঃ + আশ = প্রাতরাশ (এটি র-জাত বিসর্গের উদাহরণ, প্রাতর্ + আশ)।

সূত্র ৬ (বিসর্গের পর র থাকলে): বিসর্গের পর ‘র’ থাকলে বিসর্গ লোপ পায় এবং বিসর্গের পূর্ববর্তী হ্রস্ব স্বর দীর্ঘ হয়।

  • নিঃ + রব = নীরব (ই-কার দীর্ঘ ঈ-কার হয়েছে)।

  • নিঃ + রস = নীরস।

  • নিঃ + রোগ = নীরোগ।

সূত্র ৭ (বিসর্গের অব্যয় অবস্থা): বিসর্গের পর ক, খ, প, ফ থাকলে বিসর্গ সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে।

  • প্রাতঃ + কাল = প্রাতঃকাল।

  • মনঃ + কষ্ট = মনঃকষ্ট।

  • অতঃ + পর = অতঃপর। (ব্যতিক্রম: নমঃ + কার = নমস্কার, পুরঃ + কার = পুরস্কার, তিরঃ + কার = তিরস্কার— এখানে বিসর্গ ‘স’ হয়ে যায়)।


নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)

পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার জন্য এই অংশ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে। যে সব সন্ধি ব্যাকরণের সাধারণ কোনো সূত্র বা নিয়ম মানে না, তাদের ‘নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি’ বলে। এগুলো মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ক. নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি:

  • কুল + অটা = কুলটা (নিয়ম অনুযায়ী কুলাটা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি)।

  • গো + অক্ষ = গবাক্ষ।

  • প্র + উঢ় = প্রৌঢ়।

  • সার + অঙ্গ = সারঙ্গ।

  • সীমন + অন্ত = সীমান্ত (চুলের সিঁথি অর্থে)।

  • মার্ত + অণ্ড = মার্তণ্ড।

  • শুদ্ধ + ওদন = শুদ্ধোদন।

খ. নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জনসন্ধি:

  • আ + চর্য = আশ্চর্য।

  • গো + পদ = গোষ্পদ।

  • বৃহৎ + পতি = বৃহস্পতি।

  • বন + পতি = বনস্পতি।

  • তৎ + কর = তস্কর।

  • পতৎ + অঞ্জলি = পতঞ্জলি।

  • ষট + দশ = ষোড়শ।

  • এক + দশ = একাদশ।

  • দিব + লোক = দ্যুলোক।

গ. নিপাতনে সিদ্ধ বিসর্গ সন্ধি / বিশেষ নিয়মের সন্ধি:

  • বাচঃ + পতি = বাচস্পতি।

  • অহঃ + অহ = অহরহ।

  • অহঃ + নিশ = অহর্নিশ।

  • ভাঃ + কর = ভাস্কর।


প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বিশেষ টিপস ও শর্টকাট

শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় (SLST/TET) সন্ধি থেকে মূলত তিন ধরনের প্রশ্ন আসে: ১. সন্ধি বিচ্ছেদ করুন। ২. সন্ধিবদ্ধ শব্দটি কী হবে? ৩. এটি কোন সন্ধির উদাহরণ (স্বর/ব্যঞ্জন/বিসর্গ/নিপাতনে সিদ্ধ)?

কৌশল ও সতর্কতা:

  1. বানান খেয়াল করুন: সন্ধি বিচ্ছেদের সময় মূল শব্দের বানান খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ‘পরীক্ষা’ (পরি + ঈক্ষা)। এখানে ‘পরি’ বানানে হ্রস্ব-ই এবং ‘ঈক্ষা’ বানানে দীর্ঘ-ঈ। পরীক্ষক অপশনে (পরি + ইক্ষা), (পরী + ঈক্ষা) দিয়ে বিভ্রান্ত করতে পারেন।

  2. দীর্ঘ-ঈ এবং দীর্ঘ-ঊ যুক্ত শব্দ: ঈশ, ঈশ্বর, ঈক্ষা, ঈর্ষা, ঊর্মি, ঊর্ধ্ব— এই শব্দগুলো সন্ধি বিচ্ছেদে বারবার আসে। মনে রাখবেন এগুলোর শুরুতে দীর্ঘ স্বর বসে।

  3. সম ও সন্ এর পার্থক্য: ম-এর পর য, র, ল, ব, শ, ষ, স, হ থাকলে অনুস্বার হয় (সংবাদ = সম + বাদ)। কিন্তু ন-ফলা থাকলে সেটি ‘সম’ থেকে আসে না, সেটি ব্যঞ্জনসন্ধির ত/দ-এর নিয়মে আসে (উন্নতি = উৎ + নতি, সন্ন্যাস = সৎ + ন্যাস নয়, এটি হবে সম্ + ন্যাস— এটি একটি বিশেষ ব্যতিক্রম যেখানে সম্ এর পর ন/ম থাকলে সম্ এর ম ন/ম তে পরিণত হয়। যেমন: সম্মান = সম্ + মান। কিন্তু জগন্নাথ = জগৎ + নাথ)। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো ধরতে হবে।

  4. বিসর্গ সন্ধির ফাঁদ: ‘দুর্যোগ’ এবং ‘নীরোগ’ শব্দ দুটি বিসর্গ সন্ধি হলেও বিচ্ছেদে পার্থক্য আছে। দুঃ + যোগ = দুর্যোগ; কিন্তু নিঃ + রোগ = নীরোগ (এখানে নি দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে লেখা যাবে না, নিঃ হ্রস্ব ই-কার দিয়েই লিখতে হবে)।

  5. পুনরাবৃত্তি: নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধিগুলো খাতায় আলাদাভাবে লিখে মুখস্থ করে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ এগুলো থেকে কমন পড়ার সম্ভাবনা ১০০%।


উপসংহার

বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ প্রয়োগ এবং সাহিত্যিক রসবোধ আস্বাদনের জন্য সন্ধির জ্ঞান অপরিহার্য। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সিলেবাসে সন্ধি অন্তর্ভুক্ত করার মূল উদ্দেশ্যই হলো প্রার্থীর শব্দগঠন ও ধ্বনিতাত্ত্বিক বোধ যাচাই করা। ওপরের নিয়মগুলো যদি আপনি আত্মস্থ করতে পারেন এবং বিগত বছরের প্রশ্নাবলি (Previous Years’ Questions) নিয়মিত অনুশীলন করেন, তবে সন্ধি থেকে আসা যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আপনার পক্ষে মুহূর্তের ব্যাপার হবে। মনে রাখবেন, ব্যাকরণ মুখস্থ করার চেয়ে সূত্র বুঝে পড়লে তা মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী হয়। আপনার প্রস্তুতির জন্য শুভকামনা!